
ধামইরহাট (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
নওগাঁর পত্নীতলা দিবর দিঘী বা দিবরের দীঘি জেলার পত্নীতলা উপজেলার দিবর ইউনিয়নের পত্নীতলা-সাপাহার রাস্তার উত্তর পার্শ্বে ২কি:মি: দূরে অবস্থিত। একটি প্রাচীন ঐতিহাসিক দীঘি। দিঘীটির জলাশয়ে প্রায় ৬০ বিঘা বা ১৯ একর বা ০.০৮ বর্গকিলোমিটার জমির উপরে অবস্থিত।
অধ্যাপকআব্দুর রাজজাক (রাজু) জানান, প্রত্নসমৃদ্ধ বরেন্দ্রভূমি অতি প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশের বরেন্দ্র অধ্যষিত উত্তরাঞ্চল ইতিহাস ও প্রত্নসম্পদে সমৃদ্ধশালী একটি জনপদ। এক সময় এইঅঞ্চল ছিল সমগ্র বাংলার প্রাণকেন্দ্র। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার রাজধানী হিসাবে প্রত্নস্থলের বগুড়ার মহাস্থানগড়(পুণ্ড্রনগর, পুণ্ড্রবর্ধন) বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলায় এবং কিছু অংশ পড়েছে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার লক্ষণাবতী (লখনৌতি), রামাবতী, বিজয়নগর গৌড়, পান্ডুয়া, ফিরোজাবাদ প্রভৃতি নগরীর অবস্থান এই অঞ্চলেই বিদ্যমান।
দিবর দীঘির প্রতিষ্ঠাতা রাজা দীব্বকের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীব্বক ছিলেন পাল রাজা দ্বিতীয় মহিপালের অধীনস্থ রাজ কর্মচারী। অপরদিকে কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে তিনি মহিপালের ছোট সেনাধক্ষ ছিলেন বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর ছোট ভাই রুদ্রক ও ভুতুসপুত্র মহা প্রতাপশালী বরেন্দ্র ত্রিপতি রাজা ভীম। অনেক ঐতিহাসিক বাংলার চরম রাজনৈতিক সংকটে দিব্যের আবির্ভাব কে স্বাগত জানান এবং তাকে দেশের ত্রাণকর্তা ও মহাপুরুষ নামে অভিহিত করেন। দিব্বকের বসতি দিব্য বরেন্দ্রভূমির আদি জাতি গোষ্ঠী কৈবর্ত বংশোদ্ভুত ছিলেন। তার জন্ম বরেন্দ্র অঞ্চলে। অনেকের মতে বরেন্দ্রভূমির পত্নীতলা থানার শিহারা ইউনিয়নের কৈবর্ত খন্ড অঞ্চলে। তিনি ছিলেন পাল রাজাদের সামন্ত ও উচ্চপদস্থ কর্মচারী। কৈবর্ত বিদ্রোহ সংঘটির সময়ে রাজা দ্বিতীয় মহিপাল ১০৭০ থেকে ১০৭৫ সনে তার সমস্ত অধীনস্থ সৈন্য বাহিনী দীব্বক এর নিকট পরাজিত হয়। যুদ্ধে মহিপাল পরাজিত নিহত হন। মহিপাল এর বিশাল সেনাবাহিনীর পরাক্রম দিব্বককে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি। তিনি তার বংশীও কৈবর্ত সেনা তারা গঠিত একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে খ্রিস্টীয় ১০৭৫ খ্রীতে মহিপালের বিশাল বাহিনীর মোকাবিলায় লিপ্ত হয়। দীব্বক তার নিজস্ব কৌশলে রাজকীয় বাহিনীকে পরাজিত করেন। রণক্ষেত্রে মহিপাল নিহত হন। রাজধানী গৌড় দখল করে দিব্যক সমগ্র বরেন্দ্রভূমি তথা উত্তরাঞ্চলে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। মহিপালের ভ্রাতা রামপাল বরেন্দ্র উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পারেননি। দিব্বক রামপালের রাজ্যের ক্ষুুদ্রাংশ বার বার আক্রমণ করে তাকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছিলেন। এদিকে বাংলার তৎকালীন ব্রাহ্মণ্যেতর সম্প্রদায়গুলির মধ্যে জন সংখ্যা ও বাহুবলে কৈবর্তরায় প্রধান ছিল। কৈবর্ত মূলত দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল কৃষিজীবী ও জেলে (হেলেও জেলে)। দিব্বকের হঠাৎ মৃত্যুর পর তার ছোটভাই রুদ্রকে আমলেও রামপাল কিছু করে উঠতে পারেননি। কিছু দিনের মধ্যেই রাজা রুদ্রকে মানে বৈরাগ্যের উদয় হলে তিনি পুত্র ভীমকে রাজ্য দিয়ে সংসার ত্যাগ করেন। পুত্র বরেন্দ্র অধিপতি হওয়ার পর সুপ্রতিষ্ঠিত কৈবর্ত শক্তি নতুনরূপে পরাক্রান্ত আকারে দেখা দেয়। অবশেষে বিজয় স্তম্ভ স্থাপক রাজা মহিপাল কে পরাজিত করে হাজার শয়তান অব্দে দিব্য বরেন্দ্র সিংহাসনে আরোহন করেন অতপর তিনি স্মৃতিস্বরূপ পদেতলা থানার বিপরীত দিঘী খনন করেন এবং দিঘির মাঝখানে দীপক বিজয়স্তম্ভটি স্থাপন করেন।