একুশের চেতনা ও একুশ শতকের বাংলাদেশ— মোঃ শহীদুল ইসলাম
নিজস্ব প্রতিনিধি:-২১ ফেব্রুয়ারি—এই তারিখটি বাঙালি জাতির ইতিহাসে কেবল একটি দিন নয়; এটি আত্মমর্যাদার এক স্থায়ী উচ্চারণ।শোকের আবহে গৌরবের দীপ্তি,আর স্মৃতির গভীরে অঙ্গীকারের অনুরণন—এই দুইয়ের মিলনে নির্মিত হয়েছে একুশের চেতনা।ভাষার অধিকারের প্রশ্নে যে জাতি রক্ত দিতে জানে,ইতিহাস তার সামনে মাথা নত করে।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে তরুণ ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমেছিল।রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখেও সালাম,বরকত,রফিক,জব্বারসহ অসংখ্য ভাষাসৈনিক জীবন উৎসর্গ করেন।তাঁদের আত্মত্যাগ কেবল একটি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেনি; তা বাঙালি জাতির রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও আত্মপরিচয়ের ভিত রচনা করেছে।
ভাষা আন্দোলন ছিল,বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রথম সুসংগঠিত প্রতিবাদ—যার ধারাবাহিকতায় বিকশিত হয় স্বাধিকার আন্দোলন এবং পরিণতিতে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় একুশ তাই কেবল ভাষার দাবি নয়,এটি ন্যায়,সাম্য ও আত্মমর্যাদার সংগ্রাম।
যে জাতি নিজের ভাষাকে রক্ষা করে,সে জাতি তার অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎকেও সুরক্ষিত করতে সক্ষম হয়।একুশ আমাদের শিখিয়েছে—অধিকার ভিক্ষায় মেলে না,তা আদায় করতে হয় ত্যাগ,সাহস ও দৃঢ় প্রত্যয়ে।এই চেতনা কেবল অতীতের স্মারক নয়,এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের নৈতিক শক্তি।
এই সংগ্রামের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও ইতিহাসে অনন্য।১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে,২০০০ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে।ভাষাগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে বৈশ্বিক অঙ্গীকার আজ উচ্চারিত হয়,তার নৈতিক ভিত্তি রচিত হয়েছিল এই বাংলার মাটিতে।
একুশ শতকের বাংলাদেশ উন্নয়নের নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে।অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত বিস্তার,প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রযাত্রা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস এখন দৃশ্যমান ও উচ্চারিত।
কিন্তু উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়,যখন তা ন্যায়বিচার,স্বচ্ছতা,জবাবদিহি ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।পরিসংখ্যান উন্নতির চিত্র দেখাতে পারে,কিন্তু নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না।একুশের চেতনা আমাদের সেই নৈতিক মানদণ্ডের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস।রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার কার্যকর প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত হয়েছে?মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা কতটা সুদৃঢ়? সামাজিক ন্যায় ও সুযোগের সমতা কতটা প্রতিষ্ঠিত? উন্নয়ন যদি মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা না দেয়,তবে তা কেবল অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকে—রাষ্ট্রগঠনে নয়।
একুশের শিক্ষা আবেগের চেয়ে গভীর এটি দায়িত্বের শিক্ষা।দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান,সামাজিক বৈষম্য হ্রাস,অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকারের সুরক্ষা—এসবই একুশের বাস্তব প্রয়োগ।ভাষা শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালন নয়,বরং ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনের ধারাবাহিক অঙ্গীকার।
প্রতি বছর একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারের দিকে নীরব পদচারণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মাথা নত করা এই জাতির ইতিহাস নয়। আত্মমর্যাদা,সাহস ও নৈতিক দৃঢ়তাই আমাদের পথচলার মূল শক্তি। সেই শক্তিকে ধারণ করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাক মর্যাদা,ন্যায়,সাম্য ও আলোকিত ভবিষ্যতের পথে।
মোঃ শহীদুল ইসলাম সাংবাদিক ও কলাম লেখক। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা,রাষ্ট্রনীতি, গণতন্ত্র এবং সমসাময়িক সমাজ-অর্থনীতির প্রশ্নে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি সুপরিচিত। জাতীয় স্বার্থ,সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের পক্ষে তিনি ধারাবাহিকভাবে মতামত প্রদান করে আসছেন।লেখকের মতামত একান্তই তাঁর নিজস্ব।